ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২০, ১৪ কার্তিক ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

স্মৃতিশক্তি বাড়ানোর ১০টি অসাধারণ টিপস!

বিবিধ ডেস্ক
স্মৃতিশক্তি বাড়ানোর ১০টি অসাধারণ টিপস!
সংগৃহীত : ছবি
Advertisement (Adsense)

কথায় আছে, বুদ্ধি থাকলে ঘরজামাই হওয়া লাগে না। আবার এই বুদ্ধির জোরে আমাদের অতি পরিচিত ২ বন্ধু আর ভাল্লুকের গল্পে ২য় বন্ধু গাছে উঠতে না পারার পরও মৃত সেজে প্রাণে বেঁচে গিয়েছিল। আবার অন্যদিকে কালিদাস নিজে যেই ডালে বসেছিল সেই ডালটিই কাটতে বসেছিল, রবীন্দ্রনাথের পড়ালেখার ছিরিতো আমরা জানি, আইনসটাইন যে একটা সময়ে অংকে কাঁচা ছিল তাওতো আমরা জানি। কাজী নজরুলতো স্কুলের গন্ডিই পেরুননি। তারমানে কি এদের সবার বুদ্ধির অভাব ছিল? অভাব যে ছিলোনা তা তো আমরা সবাই জানি বরং এরা যে কি পরিমাণ বুদ্ধির অধিকারী তা আর বলার অপেক্ষা রাখেনা। তাহলে বুদ্ধি কি? কিসের ভিত্তিতে আমরা বুদ্ধিমান বলবো একজনকে? একজন লেখককেও বুদ্ধিমান বলা চলে আবার একজন বিজ্ঞানীও বুদ্ধিমান হিসেবে পরিচিতি পায়। অন্যদিকে যে রমনী ঘরের কাজে ও রান্নায় পারদর্শী হয় তাকেও বুদ্ধিমতী বলা হয়। তাহলে বুদ্ধির সংজ্ঞাটি কি ?

বুদ্ধির সংজ্ঞা

বিভিন্ন মনোবিজ্ঞানী বিভিন্নভাবে বুদ্ধির সংজ্ঞা দিয়েছেন – মনোবিজ্ঞানী ক্যাটেল বলেন – “Intelligence is what intelligence does.” অর্থাৎ বুদ্ধি যে কাজ করে তার মধ্যেই বুদ্ধির পরিচয়। ডিয়ারবার্ণ বলেন – “বুদ্ধি হল অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে লাভবান হওয়ার ক্ষমতা।” স্টার্ন বলেন – “বুদ্ধি হল নতুন সমস্যা ও অবস্থার সাথে সংগতি বিধানের সাধারণ মানসিক শক্তি।”যে যত তাড়াতাড়ি শিখতে পারে সে ততবেশি বুদ্ধিমান। প্রকৃতি পরিবেশের সাথে খাপখাইয়ে চলার জন্য, আমাদের জীবনে সমস্ত রকম ক্রিয়াকর্ম সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য এবং সমস্ত সমস্যা সমাধান করে জীবনকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য বুদ্ধি আমাদের বড় হাতিয়ার।

বুদ্ধি বাড়ানোর উপায়

অন্যের কৌশলীবুদ্ধি দেখে অনেকে ভাবেন আহা আমি যদি এমন হতে পারতাম! একটু যদি বুদ্ধি থাকত আমার! এমন আফসোস যাদের তাদের জন্যই এই আয়োজন। হতাশ হবার কিছু নেই। যদিও বুদ্ধি বেশিরভাগই জেনেটিকাল তারপরও আছে বুদ্ধি বাড়ানোর নানা উপায়। বুদ্ধির প্রখরতা বাড়াতে কয়েকটি উপায় অবলম্বন করতে পারেন।

১.ব্যায়াম

ব্যায়াম করুন। ব্যায়াম শুধু যে ওজন কমায় তা নয়, ব্যায়াম মস্তিস্কের স্নায়ুগুলোকে সক্রিয় রাখে,মস্তিস্কে রক্ত চলাচল নিশ্চিত করে এবং প্রাণবন্ত রাখে। ব্যায়ামের মাধ্যমে ব্রেন সেলগুলো আরও বিকশিত ও শক্তিশালী হয় এবং আন্তঃযোগাযোগ বাড়ে ও মস্তিষ্ককে ড্যামাজ হওয়া থেকে প্রতিহত করে। কারণ ব্যায়ামের সময় প্রোটিন বের হয় মস্তিষ্কের সেল থেকে যা নিউরোট্রফিক ফ্যাক্টর নামে পরিচিত। এটি মস্তিষ্কের স্বাস্থ্য গঠনে সাহায্য করে এবং ব্রেনকে রক্ষা করে। এছাড়া ব্যায়ামের সময় নার্ভ প্রকেটটিং কম্পাউন্ড বের হয়ে ব্রেনকে রক্ষা করে। hippocampus নামক ব্রেন এর একটি জায়গা আছে যা ব্যায়ামের সময় আকারে বড় হয়ে যায়। এর ফলে Alzheimer’s disease প্রতিহত করতে সাহায্য করে। এই রোগ হলে মানুষ স্মৃতি ভুলে যায়। তাই ব্যায়াম শুধু শরীর কেই নয় বরং মস্তিষ্ক কেও সুস্থ রাখে ও রোগ প্রতিরোধ করে। প্রতিদিন কমপক্ষে ৩০ মিনিট ব্যায়াম করুন।

২.মস্তিষ্কের জন্য উপকারী খাদ্য গ্রহণ

পরিমিত ও সুষম খাদ্য গ্রহণ আমাদের মস্তিষ্কের সুস্বাস্থ্যের জন্য একান্ত আবশ্যক। অতিরিক্ত খাদ্য গ্রহণ আমাদের ঘুম বাড়িয়ে দেয়, যা আমাদের অলস করে তোলে। ফলে আমরা জ্ঞানার্জন থেকে বিমুখ হয়ে পড়ি। তাছাড়া কিছু কিছু খাবার আছে যেগুলো আমাদের মস্তিষ্কের জন্য খুবই উপকারী। সম্প্রতি ফ্রান্সের এক গবেষণায় দেখা গিয়েছে যয়তুনের তেল চাক্ষুস স্মৃতি (visual memory) ও বাচনিক সাবলীলতা (verbal fluency) বৃদ্ধি করে। আর যেসব খাদ্যে অধিক পরিমাণে Omega-3 ফ্যাট রয়েছে সেসব খাদ্য স্মৃতিশক্তি ও মস্তিষ্কের কার্যকলাপের জন্য খুবই উপকারী। স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধির জন্য অনেক ‘আলিম কিছু নির্দিষ্ট খাদ্য গ্রহণের কথা বলেছেন। ইমাম আয-যুহরি বলেন, “তোমাদের মধু পান করা উচিত কারণ এটি স্মৃতির জন্য উপকারী।”
মধুতে রয়েছে মুক্ত চিনিকোষ যা আমাদের মস্তিষ্কের গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাছাড়া মধু পান করার সাত মিনিটের মধ্যেই রক্তে মিশে গিয়ে কাজ শুরু করে দেয়। ইমাম আয-যুহরি আরো বলেন, “যে ব্যক্তি হাদীস মুখস্থ করতে চায় তার উচিত কিসমিস খাওয়া।”

৩.পরিমিত পরিমাণে বিশ্রাম নেয়া

আমরা যখন ঘুমাই তখন আমাদের মস্তিষ্ক অনেকটা ব্যস্ত অফিসের মতো কাজ করে। এটি তখন সারাদিনের সংগৃহীত তথ্যসমূহ প্রক্রিয়াজাত করে। তাছাড়া ঘুম মস্তিষ্ক কোষের পুণর্গঠন ও ক্লান্তি দূর করার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে দুপুরে সামান্য ভাতঘুম আমাদের মন-মেজাজ ও অনুভূতিকে চাঙা রাখে। এটি একটি সুন্নাহও বটে। আর অতিরিক্ত ঘুমের কুফল সম্পর্কে তো আগেই বলা হয়েছে। তাই আমাদের উচিত রাত জেগে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দাওয়াহ বিতরণ না করে নিজের মস্তিষ্ককে পর্যাপ্ত বিশ্রাম দেওয়া।

৪.জীবনের অপ্রয়োজনীয় ব্যাপারসমূহ ত্যাগ করা

বর্তমানে আমাদের মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতা কমে যাওয়া ও জ্ঞান অর্জনে অনীহার একটি অন্যতম কারণ হলো আমরা নিজেদেরকে বিভিন্ন অপ্রয়োজনীয় কাজে জড়িয়ে রাখি। ফলে কোনো কাজই আমরা গভীর মনোযোগের সাথে করতে পারি না। মাঝে মাঝে আমাদের কারো কারো অবস্থা তো এমন হয় যে, সালাতের কিছু অংশ আদায় করার পর মনে করতে পারি না ঠিক কতোটুকু সালাত আমরা আদায় করেছি। আর এমনটি হওয়ার মূল কারণ হচ্ছে নিজেদেরকে আড্ডাবাজি, গান-বাজনা শোনা, মুভি দেখা, ফেইসবুকিং ইত্যাদি নানা অপ্রয়োজনীয় কাজে জড়িয়ে রাখা। তাই আমাদের উচিত এগুলো থেকে যতোটা সম্ভব দূরে থাকা।এছাড়া অপ্রয়োজনীয় তথ্য মস্তিষ্কে জমা রাখা বাদ দিন। এটা কম্পিউটারের অপ্রয়োজনীয় তথ্য ডিলিট করে দেয়ার মতো। নতুন কিছু শেখা (বিদেশী ভাষা), আবিষ্কার করা বা নতুন কিছু চিন্তা করা বুদ্ধিভিত্তিক খেলায় অংশ নেয়াও মস্তিষ্ককে কর্মক্ষম রাখার আরেকটি ভালো উপায়।   

৫.হাল না ছাড়া

যে কোনো কাজে সফলতার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায় হলো হাল না ছাড়া। যে কোনো কিছু মুখস্থ করার ক্ষেত্রে শুরুটা কিছুটা কষ্টসাধ্য হয়। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে আমাদের মস্তিষ্ক সবকিছুর সাথে মানিয়ে নেয়। তাই আমাদের উচিত শুরুতেই ব্যর্থ হয়ে হাল না ছেড়ে দিয়ে আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল করে চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া

৬.সামাজিকতা

সামাজিকতা ও ভালো স্মৃতিশক্তির একটি পারস্পরিক সম্পর্ক রয়েছে। অর্থাৎ ভালো স্মৃতিশক্তিধারীরা বেশি সামাজিক হয়। তবে এতে কোনটির অবদান বেশি তা নিয়ে সন্দেহ ছিল। তবে ২০০৮ সালের এক গবেষণায় দেখা যায়, যেসব অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তি সামাজিকতায় তেমন অংশ নেন না, তাদের মস্তিষ্ক সামাজিকদের তুলনায় দ্বিগুণ হারে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়।গবেষকরা জানাচ্ছেন, সামাজিকতা আমাদের মস্তিষ্কের উপকার করে। সামাজিকতার ফলে নিজের দিকে নজর দেওয়া, চাপ কমানো ও নিউরো হরমোন নিঃসরন সহায়তা করে।

৭.একসঙ্গে অনেক কাজ (মাল্টিটাস্ক) বাদ দিন

আমরা অনেকেই একসঙ্গে অনেক কাজ (বা মাল্টিটাস্ক) করে নিজের দক্ষতা প্রমাণ করার চেষ্টা করি। কিন্তু বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক গবেষণায় দেখা গেছে, মাল্টিটাস্ক বাস্তবে মানুষকে ধীর করে দেয়। এতে মনোযোগ বিক্ষিপ্ততা তৈরি হয়, যা সৃষ্টিশীলতার তুলনায় সমস্যাই বেশি তৈরি করে।

৮.নতুন কিছু শিখুন

নতুন কোনো কাজ শেখার চেষ্টা করলে স্মৃতিশক্তি বাড়ে। এই যেমন ধরুন আপনি হয়তো কাগজের প্লেন তৈরি করতে জানেন না। সেটা শিখে নিয়ে তৈরি করুন। কিংবা নতুন কোনো কাজ করতে শুরু করুন। স্মৃতিশক্তি এতে বাড়বে।

৯.ভিন্ন পথ অনুসরণ করুন
একই পথে রোজ বাড়ি না ফিরে একটু অন্য পথে ফিরুন। একঘেঁয়েমি কোনো কাজ মস্তিষ্কের স্মৃতিশক্তি কমিয়ে দেয়। সমীক্ষায় দেখা গেছে, অফিস কিংবা কাজ থেকে বাড়ি ফিরতে অন্য কোনো পথে বাড়ি ফিরলে স্মৃতিশক্তি বাড়ে।

১০.তথ্যকে সংগঠিত করুন
বিষয়গুলো লিখুন, জটিল বিষয়গুলোর নোট নিন এবং পরে ক্যাটাগরি অনুযায়ী পুনর্বিন্যাস করুন। চেষ্টা করে এর ব্যাখ্যা বের করুন। অধিকতর জটিল বিষয়গুলোর মৌলিক ধারণার ওপর জোর দিন, বিচ্ছিন্নভাবে মুখস্থ করার চেষ্টা করবেন না।

জটিল বিষয়টি অন্যকে নিজের ভাষায় বোঝানোর ক্ষমতা অর্জন করুন। বারবার তথ্যের রিহার্সেল করুন এবং অতিরিক্ত শিখুন। যেদিন বিষয়টি শিখলেন, সেটি আবার ঝালাই করুন এবং মাঝেমধ্যে বিরতি দিয়ে আবার ঝালাই করুন।প্রতিযোগিতামূলক ও চরম গতিশীলতার এই যুগে কাজ ও জীবনের চাপে পড়ে অনেকেই স্মৃতিশক্তি হারাতে বসেছেন। কর্মব্যস্ত জীবনে স্মৃতিশক্তি ধরে রাখাটা একটা চ্যালেঞ্জ বটে। এজন্য দরকার সঠিক পন্থা অবলম্বন। তবে একটু সচেতন হলেই আপনার মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতা আপনি অটুট রাখতে পারবেন!

আরও পড়ুন

Advertisement (Adsense)