ঢাকা, মঙ্গলবার, ১২ নভেম্বর ২০১৯, ২৮ কার্তিক ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

বাবাই যখন প্রিয় বন্ধু

বিবিধ ডেস্ক
বাবাই যখন প্রিয় বন্ধু
Advertisement (Adsense)

শিশুর বেড়ে উঠার জন্য বাবা হচ্ছেন সবচেয়ে বড় সহায়ক শক্তি। পরিবারে শিশু তার নিষ্পাপ চোখে বাবাকে দেখে সবচেয়ে ক্ষমতাধর, জ্ঞানী এবং গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হিসেবে। শিশুরা জীবনের শুরুতেই আদর্শ মানুষ হিসেবে বাবাকেই দেখে। 

তাই আমাদের এবারের আয়োজনে বাবার সাথে সন্তানের সম্পর্ক নিয়ে লিখেছেন রিয়াদ খন্দকার

'এ বিশ্বকে এ শিশুর বাসযোগ্য করে যাব আমি—নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার। অবশেষে সব কাজ সেরে আমার দেহের রক্তে নতুন শিশুকে করে যাব আশীর্বাদ, তারপর হব ইতিহাস।' সুকান্তের কবিতার মতো প্রতিটি বাবাই চায় তার সন্তানের মাথায় আশীর্বাদের হাতটি রাখতে। একজন বাবা যেমন তার প্রতিচ্ছবি সন্তানের মধ্যে দেখতে চান, তিনি অবশ্যই আশা করেন, তার সন্তানটি ভবিষ্যতে সত্যিকারের একজন মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাবে। তেমনি একজন সন্তানের আশা থাকবে, তার প্রিয় বাবাটি তার চলার পথে ছায়া হয়ে, বন্ধু হয়ে আগলে রাখবেন। পথ প্রদর্শক হয়ে সঠিক দিক নির্দেশনা দেবেন। বাবার সঙ্গে সন্তানের সম্পর্ক হওয়া উচিত বন্ধুসুলভ, হূদয়ভিত্তিক ও সামাজিক। তিনি যদি সন্তানের কাছে নিজেকে বন্ধু হিসেবে উপস্থাপন করেন, সন্তানের সব বিষয়ে স্বতস্ফূর্ত অংশ নেওয়ার চেষ্টা করেন তাহলে অনেক সমস্যার সমাধান সম্ভব। 

১৯৯৩ সালে হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, বাবার সান্নিধ্যে সন্তান যত বেশি থাকবে ততই তার জ্ঞান-বুদ্ধি বৃদ্ধি পাবে। শিশুটি নিজেকে বিকশিত করার সুযোগ পাবে। শিশুর আচরণ ও সামাজিকায়নের ওপর ইতিবাচক প্রভাব এনে দিতে পারেন একজন বাবা। এখনকার বাবারা অনেক বেশি কর্মব্যস্ত। সেই সকালে তারা ঘর থেকে বের হয়ে কর্মস্থলে চলে যান, ফিরে আসেন রাতে। সারাদিনের কর্মব্যস্ততার মধ্যে তার প্রিয় সন্তানটি মনের মণিকোঠায় থাকলেও তাকে সেভাবে সময় দেওয়া তার সম্ভব হয়ে ওঠে না।

এদিকে ছোট্ট মণিটি প্রতি মুহূর্তে তার প্রিয় বাবাটিকে অসম্ভব রকম মিস করে। মনের ভেতরে এক ধরনের অভিমান জাগে, বাবা বুঝি ইচ্ছাকৃত তাকে সময় দিচ্ছে না। তারা চায় জীবনের প্রতিটি কর্মকাণ্ডে, আনন্দে-কষ্টে বাবার উপস্থিতি। বিষয়টি অনেক সময় বাবা-সন্তানের সম্পর্কে দূরত্বের দেয়াল সৃষ্টি করে। সন্তানের বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সে দূরত্ব কিছুটা কমে গেলেও এ দূরত্ব যাতে সৃষ্টি না হয় সেদিকে সচেষ্ট থাকা জরুরি। তাকে বোঝাতে হবে, একজন দায়িত্বশীল বাবা সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য, পরিবারের জন্য খেটে চলেছেন। প্রবোধকুমার সান্যাল কথায় বলতে গেলে, 'জন্মদাতা হওয়া সহজ কিন্তু বাবা হওয়া কঠিন।' সত্যিই তাই, বাবা হওয়া আসলেই কঠিন। বাবা হলেন সন্তানের জন্য এক ছায়া। যে ছায়ার রয়েছে মায়া, মমতা আর ভালোবাসা।

'আমার মা আমার সবচেয়ে ভালো বন্ধু'—এই কথাটির সাথে অধিকাংশ সন্তানই নিঃসন্দেহে একমত হবেন। কিন্তু বাবা কেন অনেকের ক্ষেত্রেই আমাদের সবচেয়ে ভালো বন্ধু হতে পারেন না? মেয়ে অথবা ছেলে সন্তান সবার কাছেই মা অনেক প্রিয়। বাবার সাথে দূরত্ব সৃষ্টির অন্যতম প্রধান কারণ হলো বাবাকে আমরা অতটা কাছে পাই না। আর আমাদের সমাজ কাঠামোতে বাবাকে আমরা দেখি সিদ্ধান্ত গ্রহণের ভূমিকায়, কড়া এক রূপে। যদিওবা মেয়েদের বাবা বেশি প্রিয় হয়ে থাকে, ছেলেদের কাছে বাবার সংস্পর্শ ছোটবেলা পর্যন্তই সীমাবদ্ধ। ছোটবেলা থেকে এই দূরত্ব শুরু হলেও সময়ের সাথে সাথে দূরত্ব বাড়ে বৈ কমে না। ছোটবেলায় সন্তানের আবদার-অনুযোগের একমাত্র আশ্রয়স্থল থাকে মা। বাবার ভূমিকা সন্তানের কাছ থেকে রিপোর্ট কার্ড দেখা, কোথাও বেড়াতে নিয়ে যাওয়া ইত্যকার কার্যাবলি পর্যন্ত। এমনকি শহুরে সমাজে সন্তানের অভিভাবক দিবসেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে মা-ই সন্তানের সাথে গিয়ে থাকেন তার স্কুলে। বাবার সাথে এই দূরত্ব সৃষ্টি কিন্তু সময়ের স্রোতে একদিন বাবা এবং সন্তান উভয়ের জন্যই আফসোসের বিষয় হবে। সন্তান ছোট থাকতেই বাবার কার্যকরী ভূমিকা পালন করা উচিত। আর সন্তান যখন অনুভব করছেন যে বাবার সাথে তার দূরত্ব তৈরি হচ্ছে তখন সন্তানও দূরত্ব দূর করতে এগিয়ে আসতে পারে। বাবাদের বলছি, আপনি যতই ব্যস্ত হোন না কেন সন্তানকে সময় দেওয়ার চেষ্টা করুন। অফিস থেকে ফেরার পর যদি সন্তানের বাড়ির কাজ দেখানোর দায়িত্বটা আপনার ওপর পড়ে থাকে তাহলে বাড়ির কাজ দেখানোর পাশাপাশি সন্তানের সাথে স্বাভাবিক গল্প-গুজব করুন। দেখবেন আপনার প্রতি সন্তানের অহেতুক ভয় দূর হয়ে যাবে। সন্তানের সকল কাজ ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করার চেষ্টা করুন। হয়তো সে ভুল করেছে বা আপনার কথা শোনেনি তবুও তার সাথে কথাবার্তা সহজ-স্বাভাবিক রাখুন। আপনি যদি রেগে কিছু বলেন, তাহলে ভয় পেয়ে পরবর্তীতে আপনার থেকে সে কথা লুকোবে। আপনি অবসরে তাকে সুন্দরভাবে তার করণীয় বিষয়গুলো বুঝিয়ে বলুন। গল্পগুজবের পাশাপাশি সন্তানদের নিয়ে বাইরে বেড়াতে যান। সেটা তার কোনো ভালো ফলাফল উপলক্ষে হতে পারে, তার জন্মদিনেও তাকে নিয়ে বাইরে বেড়াতে যেতে পারেন। সর্বোপরি, তাকে এই আশ্বাস দিন যে তার সকল প্রয়োজনে আপনি তার নির্ভরতার জায়গা হতে তৈরি আছেন। 

সন্তানকে সময় দিন 

সারা দিনের ব্যস্ততা শেষে সন্তানের জন্য তেমন সময় বাবার থাকে না। এমন পরিবারের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। ব্যস্ততা থাকবেই। কিন্তু সময় না দিলে সন্তানের সঙ্গে বাবার দূরত্ব বাড়ে। সন্তান বিপথে চলে যাওয়ার ভয়ও থাকে। তাই ব্যস্ত থাকলেও সন্তানকে সময় দেওয়া উচিত। 

  •  সন্তানের প্রয়োজন ও চাহিদা অনুযায়ী সময় ভাগ করে নিন। সন্তানের দরকারি কাজগুলো কখন করবেন তার রুটিন করুন।
  • সন্তানের সঙ্গে সকালের নাস্তা ও রাতের খাবার খেতে চেষ্টা করুন। তার কোনো সমস্যা আছে কি না জানতে চান। থাকলে সমাধান করে দিন।
  •  রাতে বাসায় ফেরার পর একসঙ্গে বসে টিভি দেখুন বা বই পড়ুন। সন্তান শিক্ষার্থী হলে ঠিক করে নিন কতক্ষণ সে আপনাকে সময় দিতে পারবে।
  •  যেটুকু সময় বাসায় থাকবেন সন্তানের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করুন। অযথা রাগারাগি করবেন না। কর্মস্থলের কারণে সৃষ্ট অভিমান বা রাগ সন্তানের ওপর ঝাড়বেন না।
  •  সন্তানের জন্য কেনাকাটা করলে তাকেও সঙ্গে নিতে চেষ্টা করুন। কেনার সময় তার মতামতকে গুরুত্ব দিন।
  • দুপুরে সে কোথায় আছে, খেয়েছে কি না ইত্যাদি ফোন করে জানুন। আবার অকারণে ফোন করবেন না। তাহলে সে ধরে নেবে তাকে পাহারা দিচ্ছেন।
  •  সন্তানকে নিয়ে কিছু দিন পর পর কোথাও ঘুরতে যান। তার সঙ্গে মেশার সবচেয়ে ভালো উপায় এটি। বেড়াতে বেড়াতে গল্প করুন, তাকে বিভিন্ন বিষয় শেখান।
  • সন্তানের জন্মদিনে বা যেকোনো দিবসে তাকে উপহার দিন। কাছের বন্ধুবান্ধব ও আত্মীয়স্বজনকে নিয়ে বাসায় অনুষ্ঠান করুন।
  •  সন্তান মানসিক কোনো সমস্যায় পড়লে বুঝতে চেষ্টা করুন। সরাসরি না জানতে চেয়ে অন্যভাবে বুঝুন।
  •  সন্তান ও তার বন্ধুবান্ধব নিয়ে মাঝে মাঝে বাসায় গেট টুগেদারের আয়োজন করুন। এতে সে সামাজিকতা শিখবে। আর আপনি বুঝতে পারবেন আপনার সন্তান কার সঙ্গে মিশছে, তারা কেমন।
  •  ছুটির দিনটি বাসায় কাটাতে চেষ্টা করুন। সন্তান যখন বুঝবে সপ্তাহের একটি দিনে আপনাকে বাসায় পাওয়া যাবে তখন তার সব প্রয়োজন ও চাহিদা সে ওই দিনের জন্য রেখে দেবে।
  • সন্তানকে নিজের কাজগুলো ছোটবেলা থেকেই করতে শেখান। বড় হয়ে সে যখন দেখবে তার মা-বাবা ব্যস্ত থাকেন তখন বিষয়টি বুঝতে পারবে এবং অনেক বিষয়ের সঠিক সিদ্ধান্ত সে একাই নেবে।
  •  সন্তানকে বই পড়তে দিন। এতে আপনি না থাকলেও বইটি পড়ার সময় সে আপনার কথা মনে রাখবে। বইটি পড়া হয়েছে কি না জানতে চান।
  •  সন্তানকে কতটা সময় দিলেন তার চেয়ে কিন্তু তার সঙ্গে আপনার সম্পর্ক কেমন সেটা গুরুত্বপূর্ণ। তাই স্বাভাবিক সম্পর্ক বজায়  রাখুন।

 

আরও পড়ুন

Advertisement (Adsense)